কিন্তু সেই রেশ কাটতে না কাটতেই শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধ বৈশ্বিক বাণিজ্যিক স্থিতিশীলতাকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইরানি নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এখন বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক বড় ‘শক’ বা অভিঘাত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। যুদ্ধের দ্রুত অবসান না ঘটলে বিশ্ব অর্থনীতি এক দীর্ঘমেয়াদি মন্দার কবলে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এ যুদ্ধ কেবল মধ্যপ্রাচ্যের ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর নেতিবাচক প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে। বিশেষ করে ভঙ্গুর অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য যুদ্ধপরিস্থিতি এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের অর্থনৈতিক সংকটের প্রধান কারণ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়া। পথটি দিয়েই বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়।
এমআইটির অধ্যাপক ও ২০২৪ সালের নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ সাইমন জনসন বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। তার মতে, দৈনিক ২০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল এ পথ দিয়ে যায়, যা পূরণ করার মতো বিকল্প সক্ষমতা বিশ্বের আর কোথাও নেই।
আইএমএফের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মরিস অবস্টফেল্ড এ পরিস্থিতিকে একটি ‘নাইটমেয়ার সিনারিও’ বা দুঃস্বপ্ন হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
মূল্যস্ফীতি ও খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকি
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ কেবল তেলের দাম বাড়ায়নি, বরং বিশ্বজুড়ে সার ও খাদ্যের বাজারেও অস্থিরতা তৈরি করেছে। আইএমএফের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা সতর্ক করে জানিয়েছেন, তেলের দাম যদি দীর্ঘমেয়াদে ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়, তবে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি দশমিক ৪ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়বে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক উৎপাদন দশমিক ২ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি সারের উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে, ফলে স্বল্পোন্নত দেশগুলোয় খাদ্য সংকটের ঝুঁকি তীব্র হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা এখন এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিশেষ করে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এখন বহুমুখী সংকটের মুখে।
জয়-পরাজয়ের সমীকরণ ও অনিশ্চয়তা
ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের অর্থনীতিবিদ নিল শেয়ারিংয়ের মতে, এ যুদ্ধ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে স্পষ্টত কিছু ‘বিজয়ী’ ও ‘পরাজিত’ পক্ষ তৈরি করছে। ইউরোপের অধিকাংশ দেশসহ দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, জাপান, ভারত ও চীনের মতো জ্বালানি আমদানিকারকরা এ উচ্চমূল্যের কারণে চরম ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। অন্যদিকে পাকিস্তানের মতো ভঙ্গুর অর্থনীতির দেশগুলো বিশেষ সংকটে পড়েছে। দেশটি নিজেদের প্রয়োজনীয় জ্বালানির ৪০ শতাংশ আমদানি করে এবং কাতারের লিকুইফায়েড ন্যাচারাল গ্যাসের (এলএনজি) ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। যুদ্ধাবস্থায় এ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বহু গুণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার কমাতে না পেরে উল্টো বাড়াতে বাধ্য হতে পারে, যা অর্থনীতিকে আরো সংকুচিত করবে।
ভবিষ্যতের অনিশ্চিত পথ
সংকট কতদিন স্থায়ী হবে, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। ইরানে নতুন নেতা হিসেবে মোজতবা খামেনির উত্থান এ উত্তেজনাকে আরো দীর্ঘায়িত করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ তার পিতার তুলনায় তাকে আরো কট্টরপন্থী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পাশাপাশি এ যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত লক্ষ্য কী, তা নিয়েও অস্পষ্টতা রয়েছে। সাইমন জনসন এ বিষয়ে বলেন, ‘পুরো বিষয়টি এখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর নির্ভর করছে এবং তিনি ঠিক কখন নিজের “বিজয়” ঘোষণা করবেন, তা এখনো অনিশ্চিত।’ তবে আশার কথা শুনিয়েছেন কর্নেল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এসওয়ার প্রসাদ। তিনি মনে করেন, বিশ্ব অর্থনীতি এর আগে ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ট্রাম্পের বিশাল শুল্ক আরোপের মতো বড় ধাক্কা সামলে নেয়ার সক্ষমতা দেখিয়েছে। যদি তেলের দাম পুনরায় ৭০-৮০ ডলারের মধ্যে ফিরে আসে, তবে বিশ্ব অর্থনীতি এ বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হতে পারে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ এখন নির্ভর করছে হরমুজ প্রণালি পুনরায় পুরোপুরি খুলে দেয়া এবং ভূরাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসার ওপর।
২০২৫ সালে ট্রাম্পের আরোপিত শুল্ক ও চার বছর আগের ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কা সামলে বিশ্ব অর্থনীতি কিছুটা সহনশীলতা দেখালেও বর্তমান সংকট কতদিন স্থায়ী হবে, তার ওপরই সবকিছু নির্ভর করছে। যুদ্ধের দ্রুত অবসান না ঘটলে বিশ্ব অর্থনীতি এক দীর্ঘমেয়াদি মন্দার কবলে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এপি অবলম্বনে